২০২৬ সালের একুশে পদক বিজয়ীদের তালিকা যখন প্রকাশিত হলো, তখন শিল্পরসিক ও গুণীজনদের মাঝে একটি নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হতে শুরু করল—প্রফেসর ড. মোঃ আব্দুস সাত্তার। বাংলাদেশের চিত্রকলা, বিশেষ করে প্রাচ্যশিল্প বা ‘ওরিয়েন্টাল আর্ট’-কে যারা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছেন, তিনি তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। শিক্ষকতা, শিল্পতাত্ত্বিক গবেষণা এবং ক্যানভাসে রঙের জাদুকরী মিশেলে তিনি কয়েক দশক ধরে আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছেন।
চলুন, ২০২৬ সালের একুশে পদকপ্রাপ্ত এই বরেণ্য শিল্পীর জীবন ও কর্ম নিয়ে বিস্তারিত একটি পরিক্রমায় নামি।
একুশে পদক ২০২৬: মেধার স্বীকৃতি
২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এ বছরের একুশে পদক বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করেন। এই তালিকায় চারুকলা বিভাগে অনন্য অবদানের জন্য প্রফেসর ড. মোঃ আব্দুস সাত্তারের নাম ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ পাঁচ দশকের নিরবচ্ছিন্ন শিল্পসাধনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক চারুকলার বিকাশে তাঁর ভূমিকা এ পদকের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করল।

২০২৬ সালের একুশে পদকের জন্য মনোনীতরা হলেন-
- চলচ্চিত্রে ফরিদা আক্তার ববিতা,
- চারুকলায় অধ্যাপক মো. আবদুস সাত্তার,
- স্থাপত্যে মেরিনা তাবাসসুম,
- সংগীতে আইয়ুব বাচ্চু (মরণোত্তর),
- নাট্যকলায় ইসলাম উদ্দিন পালাকার,
- সাংবাদিকতায় শফিক রেহমান,
- শিক্ষায় অধ্যাপক মাহবুবুল আলম মজুমদার,
- ভাস্কর্যে তেজস হালদার যশ এবং
- নৃত্যকলায় অর্থী আহমেদ।
- এ ছাড়া ব্যান্ড ওয়ারফেজকে সংগীত দল হিসেবে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন: শেকড় থেকে শিখরে
প্রফেসর আব্দুস সাত্তারের জন্ম ২রা ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৮ সালে নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার চকবড়াই গ্রামে। সাংঃ চকবড়াইগ্রাম, পোঃ বড়াইগ্রাম, থানাঃ বড়াইগ্রাম, জেলাঃ নাটাের।
পিতা : মরহুম মোঃ নাজিরউদ্দিন সরকার, মাতাঃ আনেছা বেগম ।
তাঁর শৈশব কেটেছে মাটির কাছাকাছি, প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে। আর সেই শৈশবের প্রকৃতির রূপই পরবর্তীতে তাঁর রেখা ও রঙে বিমূর্ত হয়ে উঠেছে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা
তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি নিজ গ্রামেই। নাটোর বড়াইগ্রাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন। এরপর পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে এইচএসসি পড়ার জন্য ভর্তি হন এবং ১৯৬৬ সালে তা সফলভাবে সম্পন্ন করেন।
চারুকলার আঙ্গিনায়
চিত্রকলায় উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ) থেকে ১৯৭১ সালে তিনি বিএফএ(ব্যাচেলর অব ফাইন আর্টস) ডিগ্রি লাভ করেন। উল্লেখ্য যে, তিনি বিএফএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএফএ (মাস্টার অব ফাইন আর্টস) ডিগ্রি লাভ করেন এবং ২০০০ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
উচ্চতর শিল্পশিক্ষা
স্বাধীনতার ঠিক পরেই ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে তিনি চলে যান বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিনিকেতন কলাভবনে। সেখানে ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি উচ্চতর শিল্পশিক্ষা গ্রহণ করেন। শান্তিনিকেতনের সেই দিনগুলোই মূলত তাঁর প্রাচ্যশিল্পের দর্শনে আমূল পরিবর্তন আনে।
তিনি শুধু প্রাচ্যতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। আমেরিকা সরকারের মর্যাদাপূর্ণ ফুলব্রাইট গ্রান্ট নিয়ে ১৯৮৭ সালে নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত ‘প্রাট ইনস্টিটিউট’ থেকে ডিস্টিংশনসহ ছাপচিত্রে (Printmaking) এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

এছাড়া ভারতের চুনারে স্টোন কার্ভিং ক্যাম্প, আমেরিকার জর্জটাউন ইউনিভার্সিটিতে ইংলিশ লিটারেচার এবং দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের স্কলারশিপে ভিজিটিং হিসেবে কোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে কোরিয়া ল্যাংগুয়েজে অংশ গ্রহণ।
এই প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মিশ্র শিক্ষা তাঁকে এক স্বতন্ত্র শিল্পীসত্তা দান করেছে।
প্রাচ্যশিল্পের রাজপুত্র: শিল্পকলা ও শৈলী
বাংলাদেশে প্রাচ্যশিল্প বা ‘ওরিয়েন্টাল আর্ট’ এক সময় প্রায় স্তিমিত হয়ে পড়েছিল। প্রফেসর আব্দুস সাত্তার সেই শিল্পী, যিনি এই ধারার পুনরুজ্জীবনে প্রাণভোমরা হিসেবে কাজ করেছেন।
ওয়াশ টেকনিকের কারিগর
তিনি মূলত ‘ওয়াশ পদ্ধতি’ বা ধৌতকরণ পদ্ধতিতে ছবি আঁকার জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই পদ্ধতিতে রঙের গভীরতা ও কোমলতা এক অপূর্ব দ্যোতনা তৈরি করে। তাঁর ক্যানভাসে প্রায়শই দেখা যায়:
পাখি ও প্রকৃতি: তাঁর ছবিতে পাখিরা কেবল জড়বস্তু নয়, তারা স্বাধীনতার প্রতীক।
নারী ও জোছনা: বাঙালি নারীর চিরায়ত রূপ এবং নীল জোছনার স্নিগ্ধতা তাঁর ছবির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।
মানবিক আবেগ: তাঁর চিত্রকলায় সৌন্দর্য থাকলেও তার পেছনে অনেক সময় চাপা কষ্ট, যন্ত্রণা এবং ১৯৭১-এর যুদ্ধের ক্ষতও পরোক্ষভাবে উঠে আসে।
তিনি নিজেই একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “শিল্প হলো প্রশান্তির জায়গা। আমি চাই দর্শক যখন আমার ছবি দেখবে, তখন যেন তারা জীবনের রূঢ়তা ভুলে কিছুক্ষণ সুন্দরের মাঝে ডুবে থাকে।”
শিক্ষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অবদান
প্রফেসর আব্দুস সাত্তার কেবল একজন শিল্পীই নন, তিনি একজন কিংবদন্তি শিক্ষক। ১৯৭৪ সাল থেকে তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগে তিনি দীর্ঘদিন বিভাগীয় প্রধান ও প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীকালে তিনি এই অনুষদের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অনারারি প্রফেসর। তাঁর হাজার হাজার শিক্ষার্থী আজ দেশ-বিদেশের শিল্পাঙ্গন দখল করে আছেন। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি কেবল একজন শিক্ষক নন, বরং একজন পথপ্রদর্শক ও ‘গুরু’। চারুকলার শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রাচ্যশিল্পের প্রতি আগ্রহ তৈরি এবং সিলেবাস আধুনিকীকরণে তাঁর ভূমিকা অপরিসীম।
লেখক ও কলামিস্ট: লেখনীর শক্তিতে শিল্পতত্ত্ব
একজন সফল চিত্রশিল্পীর পাশাপাশি প্রফেসর আব্দুস সাত্তার একজন ক্ষুরধার লেখক। তিনি কেবল ছবি আঁকেন না, ছবির তত্ত্ব ও ব্যাকরণ নিয়েও নিরলস কাজ করেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৫ টিরও বেশি, যার মধ্যে অনেকগুলোই বাংলাদেশের শিল্প শিক্ষার রেফারেন্স বুক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ:
- শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন: জয়নুলের জীবন ও কাজের ওপর এটি একটি আকর গ্রন্থ।
- শিল্পের উপকরণ ও ব্যবহার পদ্ধতি: চারুকলার শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি হ্যান্ডবুক।
- শিল্প সংস্কৃতি রাজনীতি: শিল্পের সঙ্গে সমাজের ও রাজনীতির সংযোগ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী কাজ।
- বাংলাদেশের নতোন্নত দারুশিল্প: বাংলাদেশের কাঠের কাজের ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা।
- জয়নুলের এগারজন সহকর্মী: চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষকদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি।
- শিল্পকলা যুগে যুগে
- শিল্পবোধ ও শিল্প বিচার
- ল্যান্ডস্কেপ
- বিশ্ব সভ্যতা ও শিল্পকলার ইতিহাস
- অলংকার
- পশ্চিমা শিল্পের আগ্রাসন ও পূ্র্ব-পশ্চিম দ্বন্দ্ব
- শিল্পীর মডেল
- বাংলার চিত্রে প্রাচ্যশৈলী সন্ধান
- বেলা-অবেলা
- বাংলার শাসক জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও গ্রাফিতির বিপ্লব
- শিল্পের উপকরণ শিল্প সংরক্ষণ ও মেরামত পদ্ধতি
- হাসি
- প্রাচ্যচিত্রের সৌন্দর্য
- বাংলাদেশের শিল্পী ও শিল্প
- আমেরিকার শিক্ষা
- প্রকৃত শিল্পের স্বরূপ সন্ধান
- শিল্পের আনন্দ
- শিল্পপ্রেমী জিয়া
- বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিক আখ্যান
- আব্দুস সাত্তারের শিল্পকর্ম
- সােমনাথ হােরের পত্র : কলকাতার চিত্র।
এছাড়াও তিনি নিয়মিত বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে শিল্পকলা, রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কলাম লিখে থাকেন। তাঁর লেখাগুলো সহজবোধ্য অথচ তথ্যসমৃদ্ধ।
পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান শিল্পী, শিল্পতাত্বিক, কলামিস্ট, ২৫ টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের লেখক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শিল্পী অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তারের শিল্পকর্ম কেবল বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও উচ্চ প্রশংসিত। তিনি এ পর্যন্ত দুটি স্বর্ণপদকসহ ৭টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং ৯টি জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন।
প্রদর্শনী: একুশটি একক এবং দেশে বিদেশে অসংখ্য যৌথ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ।
চারুকলা প্রদর্শনী ১৯৭৬ চারুকলা ইনস্টিটিউটের বার্ষিক প্রদর্শনীগুলোতে ৩ বার বিভাগীয় শ্ৰেষ্ঠ পুরস্কার।
এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী (১৯৮১): প্রথম এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীতে তিনি গ্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড (স্বর্ণপদক) লাভ করেন।
পাকিস্তান দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনী (১৯৮৭): সেখানেও তিনি স্বর্ণপদক জয় করেন।
প্রিন্টে শ্ৰেষ্ঠ পুরস্কার-জাতীয় নবীন শিল্পী। চারুকলা প্রদর্শনী-১৯৮১, ও শিল্পী কর্তৃক পুরস্কার প্রত্যািক্ষণ; গ্র্যাণ্ড এ্যাওয়ার্ড (স্বর্ন পদক)-বর্ষায় জল রঙ প্রদর্শনী ১৯৮০; শ্ৰেষ্ঠ পুরস্কার (প্রিন্ট মেকিংয়ে) জাতীয় নবীন শিল্পী।
পারচেজ এ্যাওয়ার্ড আন্তর্জাতিক দ্বিবার্ষিক গ্রাফিক আর্ট প্রদর্শনী, যুগোশ্লাভিয়া (১৯৮১);
পারচেজ এ্যাওয়ার্ড-আন্তর্জাতিক দ্বিবার্ষিকগ্রাফিক আর্ট প্রদর্শনী, যুগোশ্লাভিয়া (১৯৮৫);
পারচেজ এ্যাওয়ার্ড-আন্তর্জাতিক দ্বিবাৰ্ষিক গ্রাফিক আর্টপ্রদর্শনী, যুগােশ্লাভিয়া (১৯৮৯);
মিশর ও পোল্যান্ড: ১৯৯৩ সালে মিশরে এবং পরবর্তীতে পোল্যান্ডের আর্ট মিউজিয়াম থেকে তিনি বিশেষ সম্মাননা লাভ করেন।
সম্মান পুরস্কার-১০ম জাতীয় প্রদর্শনী ১৯৯২;
ফাস্ট সেশন প্রাইজ, ১ম মিশরিও আন্তর্জাতিক ত্রি বার্ষিক প্রিন্ট প্রদর্শনীতে পুরস্কার (১৯৯৩);
সম্মান পুরস্কার-১১তম জাতীয় প্রদর্শনী ১৯৯৪
পারচেজ এ্যাওয়ার্ড-আমেরিকার পাের্টল্যাণ্ড আর্ট মিউজিয়াম, আন্তর্জাতিক প্রিন্ট প্রদর্শনী (১৯৯৭);
ক্যালিগ্রাফি শিল্পে অবদানের জন্য তিনি বাংলাদেশ চারু শিল্পী পদক ২০২২ পান।
এছাড়া পুরস্কারস্বরূপ পেয়েছেন জাপান থেকে সার্টিফিকেট অব মেরিট, পেয়েছেন তাইওয়ানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বহু সার্টিফিকেট। পেয়েছেন বহু সম্মাননা ক্রেস্ট।
সংগ্রহ
দেশ-বিদেশের যে সকল প্রতিষ্ঠান ড. আব্দুস সাত্তারের শিল্পকর্ম স্থায়ীভাবে প্রদর্শনের জন্য সংগ্রহ করেছে সেগুলো হলো-
- আমেরিকার পাের্টল্যান্ড আর্ট মিউজিয়াম,
- মিউজিয়াম অব অবর্ন ইউনিভারসিটি, আমেরিকা,
- নরওয়ের মিউজিয়াম অব কন্টেম্পােরারি গ্রাফিক আর্ট,
- মালয়েশিয়ার ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারি,
- যুগােস্লাভিয়ার মিউজিয়াম অব কন্টেম্পােরারি আর্ট এবং
- বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর, দি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর পাবলিক
২০২৬-এর একুশে পদক: কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
প্রফেসর ড. মোঃ আব্দুস সাত্তারকে একুশে পদক প্রদান করা কেবল একজন ব্যক্তিকে সম্মানিত করা নয়, বরং বাংলাদেশের প্রাচ্যশিল্পধারাকে সম্মানিত করা। শিল্পকলার এই শাখাটি অনেক সময় অবহেলিত থাকে, কিন্তু প্রফেসর সাত্তার প্রমাণ করেছেন যে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী এই ধারাটি আধুনিক বিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে পারে।
২০২৬ সালের পদকপ্রাপ্তদের তালিকায় যখন ফরিদা আক্তার ববিতা (চলচ্চিত্র) বা আইয়ুব বাচ্চুর (সংগীত-মরণোত্তর) মতো জনপ্রিয় নামগুলো ছিল, তখন চারুকলার প্রতিনিধি হিসেবে ড. সাত্তারের নাম এই পুরস্কারের মর্যাদাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি তরুণ শিল্পীদের জন্য একটি বার্তা যে—নিজের শেকড় আঁকড়ে ধরেও বিশ্বজয় করা সম্ভব।
নাটোর কেবল ইতিহাস আর বনলতার শহর নয়, এটি জ্ঞান ও সৃজনশীলতার এক উর্বর ভূমি। এই জনপদ যেমন মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়, বিশ্বখ্যাত ইতিহাসবিদ স্যার যদুনাথ সরকারের জন্ম দিয়ে ধন্য হয়েছে, তেমনি সমৃদ্ধ হয়েছে হাশার উদ-দীন কবিরত্ন, শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ এম এ হামিদ এবং ঐতিহ্য-গবেষণার প্রাণপুরুষ সমর পালের মতো গুণীজনদের পদচারণায়। নাটোরের এই মেধার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকারকেই যেন একবিংশ শতাব্দীতে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেলেন অধ্যাপক মো. আবদুস সাত্তার। ২০২৬ সালে তাঁর এই একুশে পদক জয় কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং যদুনাথ সরকারের ইতিহাসবোধ কিংবা সমর পালের তুলির টানের মতো আবদুস সাত্তারের ‘উডকাট’ শিল্পও নাটোরের মাটির সেই চিরন্তন সৃজনশীলতাকে বিশ্বদরবারে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করল। এই মহান মনীষীদের উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর এই স্বীকৃতি নাটোরের সাংস্কৃতিক ললাটে এক উজ্জ্বল তিলক হয়ে থাকবে।
একটি জীবন্ত অনুপ্রেরণা
প্রফেসর ড. মোঃ আব্দুস সাত্তার এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি সারা জীবন নিভৃতে কাজ করে গেছেন। তাঁর ক্যানভাস কথা বলে, তাঁর কলম অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে এবং তাঁর শিক্ষা পরবর্তী প্রজন্মকে আলোকিত করে। ৭৬ বছর বয়সে এসেও তিনি যে উদ্যম নিয়ে কাজ করছেন, তা বিস্ময়কর।
তিনি শুধু শিল্পকর্মেই নন, পারিবারিক জীবনেও একজন সফল ব্যক্তি। হতাশায় নিমজ্জিত না হয়ে কিভাবে অবিচল থেকে নিজের কাজ নিরলসভাবে করে যেতে হয়, সততা ও নৈতিকতা ব্যক্তিত্বকে যে সাবলাইম পর্যায়ে নিয়ে যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার।

একুশে পদক ২০২৬-এ তাঁর এই প্রাপ্তি প্রতিটি শিল্পানুরাগীর জন্য আনন্দের সংবাদ। তিনি কেবল নাটোরের সন্তান নন, তিনি সমগ্র বাংলাদেশের সম্পদ। তাঁর রেখা ও রঙের এই যাত্রা দীর্ঘজীবী হোক—এই আমাদের প্রত্যাশা।